প্রশ্নঃ ষোড়শ মহাজনপদের যুগ বলতে কী বোঝায়? 16টি মহাজনপদের উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যা জানো লেখো।

By Nitish Paul

Published on:

ঐতিহাসিক পাজিটার, ড. হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী, ড. ব্যাসাম প্রমুখের পরিশ্রমসাধ্য গবেষণার ফলে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে উত্তর ভারতের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ইতিহাস জানা সম্ভব হয়েছে। এই যুগের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল বৌদ্ধগ্রন্থ ‘অঙ্গুত্তরনিকায়’, ‘মহাবস্তু’, ‘জাতক’, ‘ললিতবিস্তার’, জৈনগ্রন্থ ‘ভাগবতীসূত্র’ এবং হিন্দু পুরাণসমূহ। এই সকল গ্রন্থ থেকে জানা যায় এই সময়ে ভারতে কোনো কেন্দ্রীয় রাজশক্তি ছিল না এবং কোনো অখন্ড সর্বভারতীয় রাজ্যও গড়ে ওঠেনি। গোটা উত্তর ভারত ষোলোটি বৃহৎ রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এদেরকে একত্রে বলা হত ‘ষোড়শ মহাজনপদ’। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের সূচনা থেকে মগধের উত্থান পর্যন্ত সময়কে ‘ষোড়শ মহাজনপদের যুগ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। ‘জন’ বলতে বোঝায় উপজাতি বা গোষ্ঠী। ‘জনপদ’ হল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক এলাকা বা রাজ্য। ‘মহাজনপদ’ হল আরও শক্তিশালী ও বৃহত্তর আয়তনযুক্ত রাজ্য।

  • প্রেক্ষাপট:

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মূলত বিহার ও উত্তরপ্রদেশকে কেন্দ্র করে এইসব রাজ্যগুলি গড়ে ওঠে। লোহার তৈরি শক্ত হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতির সাহায্যে পাথুরে ও জঙ্গলাকীর্ণ জমিকে কৃষিকার্যের অধীনে আনা হয়। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনের ফলে নগরের বিকাশ ঘটে এবং রাজন্যবর্গ, সৈন্য-সামন্ত ও কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে বিশাল রাজ্য গঠনে তৎপর হন। এইভাবে এই সময়ে ষোলোটি বৃহৎ রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। এগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল-

১. কাশী: প্রথমদিকে কাশী ছিল সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ রাজ্য। এর রাজধানী ছিল বারাণসী। বরুণ ও অসি নামে গঙ্গার দুই শাখানদী এই নগরটিকে বেষ্টন করে ছিল বলে এর নাম হয় বাবাণসী। ‘জাতক থেকে কোশল’ ও অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে কাশীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা জানা যায়।

২. কোশল: বর্তমান উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চল নিয়ে গঠিত কোশল ছিল একটি বৃহৎ রাজ্য। এর রাজধানী ছিল শ্রাবস্তী। মগধ রাজ্যের উত্থানের পূর্বে কোশল ছিল উত্তর ভারতের শ্রেষ্ঠ শক্তি। ইক্ষাকু বংশের মহাকোশল এখানে রাজত্ব করতেন। তিনি তাঁর কন্যা কোশলদেবীর সঙ্গে মগধ রাজ বিম্বিসারের বিবাহ দেন।

৩.অঙ্গ: বর্তমান বিহারের ভাগলপুর ও মুঙ্গের জেলা নিয়ে অঙ্গরাজ্য গঠিত ছিল। গঙ্গা ও চম্পা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত চম্পা নগরী ছিল এই রাজ্যের রাজধানী। এই রাজ্যের সমৃদ্ধির মূলে গঙ্গার পাড় ধরে চলা সমৃদ্ধ ব্যাবসাবাণিজ্য। বলা হয় যে, চম্পার বণিকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আন্নাম ও কোচিন চিনে চম্পা নামে একটি হিন্দু উপনিবেশ গড়ে তোলে। চম্পার বা অঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মগধ। শেষে মগধরাজ বিম্বিসার অঙ্গ রাজ্যটিকে গ্রাস করেন।

৪. মগধ: বর্তমান বিহারের গয়া ও পাটনা জেলা নিয়ে মগধ রাজ্য গঠিত ছিল। এই রাজ্যের রাজধানী ছিল গিরিব্রজ, রাজগৃহ ও পাটলিপুত্র। এই রাজ্যের ভূমি ছিল খুব উর্বর এবং জনগণ ছিল সাহসী ও পরিশ্রমী। হর্ষঙ্ক বংশীয় রাজা বিম্বিসারের সময় মগধ শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত মগধকে কেন্দ্র করে সর্বপ্রথম এক সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে।

৫. বৃজি: গঙ্গানদীর উত্তর ভাগ থেকে নেপাল পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগ নিয়ে বৃজি বা বজ্জি প্রজাতন্ত্র গঠিত ছিল। রিস ডেভিডস ও কানিংহাম-এর মতে, শাক্য, লিচ্ছবি, জাতৃক, বিদেহ ও বৃজি প্রভৃতি আটটি গোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে এই প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। বৈশালী (মজঃফরপুর জেলা) ছিল এই রাজ্যের রাজধানী।

৬. মল্ল: উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলায় মল্ল রাজ্য অবস্থিত ছিল। এটিও ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাজ্য। এর রাজধানী ছিল দুটি-কুশীনগর ও পাবা।

৭. চেদি: যমুনা নদীর তীরে বর্তমান বুন্দেলখণ্ড এলাকায় অবস্থিত ছিল চেদি রাজ্যটি। এর রাজধানী ছিল শুকতিমতী (বান্দা)। কাশী রাজ্যের সঙ্গে চেদিদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

৮.বৎস: উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদের কাছে বৎস রাজ্যটি অবস্থিত ছিল। এর রাজধানী ছিল প্রাচীন কৌশাম্বী নগরী (বর্তমান কোশাস)। বৎস রাজ উদয়ন প্রাচীন ভারতের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তুলা এবং তুলাজাত বস্ত্র উৎপাদন ছিল এই রাজ্যের প্রধান শিল্প।

৯. কুরু: দিল্লী অঞ্চল নিয়ে কুরু রাজ্য গঠিত ছিল। কুরু রাজ্যের রাজধানী ছিল ইন্দ্রপ্রস্থ। হস্তিনাপুর ছিল এই রাজ্যের অন্যতম প্রধান নগর। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে যুধিষ্ঠিরের বংশধরেরা এখানে শাসন করতেন। এই রাজ্যটি ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল।

১০. পাঞ্চাল: বর্তমান রোহিলখণ্ড অঞ্চলে পাঞ্চাল রাজ্যটি গঠিত ছিল। এর রাজধানী ছিল দুটি-অহিচ্ছত্র এবং কাম্পিল্য। কুরু ও পাঞ্চাল রাজ্যের মধ্যে বহুবার সংঘর্ষ হয়েছে।

১১. মৎস: বর্তমান রাজপুতানার জয়পুর, ভরতপুর ও আলোয়ার নিয়ে মৎস রাজ্য গঠিত ছিল। বিরাট ছিলেন এই রাজ্যের রাজা। তাঁর নামানুসারে এই রাজ্যের রাজধানীর নাম বিরাটনগর (বৈরাট)।

১২. শূরসেন: পাঞ্চালের পাশে যমুনা নদীর তীরে এই রাজ্যটি অবস্থিত ছিল। এর রাজধানী ছিল মথুরা। সারেবংশীয় রাজারা এখানে রাজত্ব করতেন।

১৩. অস্মক: দক্ষিণ ভারতে গোদাবরী নদীর তীরে অবস্থিত অস্মক রাজ্যের রাজধানী ছিল পোটালি, পোটান বা পোদান। অস্মক নামে জনৈক রাজর্ষি উপাদান নগরীর পত্তন করেন।

১৪. অবন্তী: মালব অঞ্চলে অবস্থিত ছিল অবন্তী রাজ্যটি। এই রাজ্যের রাজধানী ছিল দুটি- উজ্জয়িনী ও মহিস্মতী।। এই রাজ্যের অধিপতি ছিলেন প্রদ্যোৎ বা চণ্ড প্রদ্যোৎ।

১৫. গাম্বার: তক্ষশীলা ও কাশ্মীর নিয়ে গঠিত ছিল গান্ধার রাজ্যটি। এর রাজধানী তক্ষশীলা ছিল প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাক্ষেত্র ও বাণিজ্যস্থল। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে পারসিক রাজা গান্ধার জয় করেন।

১৬. কম্বোজ: গান্ধার রাজ্যের কাছেই ছিল কম্বোজ রাজ্য। এর রাজধানী ছিল বীরপুর। আর্যরা ভারতে প্রবেশের সময় কম্বোজে বসবাস করে।

  • মহাজনপদগুলির সাধারণ বৈশিষ্ট্য:

মহাজনপদগুলির আলোচনা থেকে এর কতকগুলি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন- (i) খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের ঐতিহাসিক ভূগোলের এবং সেই সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা জানা যায়। (ii) ভারতে তেমন কোনো রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না, খন্ড খন্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। (iii) এগুলি বেশিরভাগই ছিল উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মধ্যপ্রদেশের মধ্যে। (iv) মূলত রাজতন্ত্র অধ্যুষিত শাসনব্যবস্থা হলেও বৃজি, মল্লর মতো প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যও ছিল। (v) এদের মধ্যে অবন্তী, বৎস, কোশল ও মগধ ছিল শক্তিশালী। আর্যাবর্তে প্রাধান্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত মগধের সাফল্যে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটে। (vi) রাজতন্ত্রের তুলনায় স্বাধীন মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে গণরাজ্যগুলি ছিল অনেক উদার।

জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার

তোমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি

6295916282; 7076398606