প্রশ্নঃ ছোটোগল্প হিসাবে পুঁইমাচার সার্থকতা আলোচনা করো।

By Nitish Paul

Published on:

nth

প্রশ্নঃ ছোটোগল্প হিসাবে পুঁইমাচার সার্থকতা আলোচনা করো।

‘বর্ষাযাপন’ নামের সোনার তরী কাব্যের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ছোটোগল্প সম্বন্ধে যা বলেছেন, তা ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে শেষ ও শ্রেষ্ঠ কথা-“ছোট প্রাণ ছোট কথা ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা নিতান্তই সহজ সরল নিয়ে ছোটগল্প। তার শিল্পমূল্য হবে গল্পশেষে নির্ণীত “অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করে মনে হবে শেষ হয়েও হইল না শেষ।” বিভূতিভূষণ পল্লীগ্রামের প্রকৃতি ও প্রকৃতির বুকে লালিত মানুষের কথক। ‘ছোট প্রাণ ছোট কথা’র আর ‘নিতান্তই সহজ সরল’ এর আদর্শ শিল্পী। ‘পুঁইমাচা’ এ দিক দিয়ে ‘পথের পাঁচালী’র গল্প রূপ। উপন্যাসের বিশালতা ছোটগল্পে সমাহিত।

“আমি কোনো বড় ঘটনায় বিশ্বাসবান নই। দৈনন্দিন ছোটখাটো সুখ-দুঃখের মধ্য দিয়ে যে জীবনধারা ক্ষুদ্র গ্রাম্য নদীর মত মন্থর বেগে অথচ পরিপূর্ণ বিশ্বাসের ও আনন্দের সঙ্গে চলেছে আসল জিনিসটা সেখানে।” (দিলীপকুমার রায়কে লেখা চিঠির পরিচয়, প্রথম বর্ষ ১৯৩১) ‘পুঁইমাচা’ যেমন বনে ঘেরা গ্রামের জীবনের কথা। গ্রামের জীবনে হীনতা, দীনতা, কুশ্রীতা আছে-তবে সহানুভূতির রসে স্নিগ্ধ। কালীময় চৌধুরী তাই এখানে ‘O Villain, Villain damned smiling Villain’ নয়, ক্ষেন্তির শাশুড়ি ‘চামার’ বটে তবে তারো MacBeth-এর ডাকিনী মনে হয় না-“Fair is Foul, Foul is Fair’ নয়। অন্যদিকে, আশ্চর্য মমতায় গড়া হয়েছে সহায়হরিকে। চাটুয্যে হয়েও বেদে-দুলে সঙ্গী যার, বিদ্যু সরকারের সাথে বুকে ব্যথা নিয়েও তামাক টানে সে। স্ত্রীকে ভয় করে-ভালোবাসে ক্ষেন্তিকে। বেহাইবাড়ির গালমন্দ সয়েও মেয়েকে আনতে ছোটে বারবার। অন্নপূর্ণা তার নামকে সার্থক করে শত দারিদ্রেও সততাকে বজায় রেখেছে। আর সর্বোপরি ক্ষেন্তি ও তার পুঁইমাচা-তার লোভের উদ্ভিদ সংরক্ষণ। এই সহজ সরল শত অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করা গ্রামের মেয়েটি চলে গেল অকালে। এত বিক্ষোভের উপাদান সত্ত্বেও এক আশ্চর্য ক্ষমতায় বিভূতিভূষণ সমাজের প্রতি খড়াপাণি হননি। ক্ষেন্তির চরিত্র ও পরিণতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নারায়ণবাবু বলেছেন-“শেষ পর্যন্ত প্রৌঢ়ের সঙ্গে তার বিয়ে, শ্বশুরবাড়িতে নিগ্রহ এবং পরিণামে সন্দেহজনক অকালমৃত্যু-অপরূপ সহমর্মিতা ও মমত্বের সঙ্গে বিবৃত হয়েছে। গল্পটির কৃতিত্ব এর রচনায়-হৃদয়ের সমস্ত সহানুভূতি উজাড় করে দিয়ে এই লেখা।” কার্ডেলিয়ার মৃত্যুর বেদনা King Lear পাঁচবার ‘never’ উচ্চারণে মর্মস্পর্শীভাবে প্রকাশ করেছেন। পুঁইমাচায়, সহায়হরি বা অন্নপূর্ণায় ক্ষেন্তির মৃত্যু দীর্ঘশ্বাস আনে, স্মৃতি বেদনায় ‘deep for tears’ হয়েও ওঠে হয়তো। তাই এভাবে সহজ জীবনের বাণীরূপ হয়ে আদর্শ ছোটগল্প হয়ে ওঠে পুঁইমাচা।

কাহিনী প্রাণকাড়া হয়েছে লেখকের অমিত নৈপুণ্যে, কিন্তু প্লটের শিথিলতায় গল্পে ত্রুটিও এনেছে। দুটি ত্রুটি প্রধানত লক্ষণীয়। (১) বাস্তবের বুদ্র বুঢ় রূপের অভাবে tragedy পূর্ণাঙ্গ হয়নি। সমাপ্তি প্রতীকী হয়েছে অশ্রুজলে দ্যোতিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ‘শাস্তি’ গল্পে যেমন ‘নির্মম’ হয়েছেন, বিভূতিভূষণের এই গল্পে তার অভাব। (২) “ছোটগল্পের আঙ্গিকে বিভূতিভূষণের নিখুঁত পারিপাট্যের অভাব। কতকগুলি গল্প কল্পনাসমৃদ্ধ ও অনুভূতির গাঢ়তার জন্য খুব চমৎকার হইয়াছে-কিন্তু গঠনের শিথিল আকস্মিকতা, দ্বিধাকম্পিত রেখা জ্ঞানপ্রবণতা ও কেন্দ্র সংহতির অভাবের জন্য তাঁহার অনেক গল্পের আর্ট ক্ষুণ্ণ হইয়াছে।” (বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা: শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়) ‘পুঁইমাচায় ক্ষেন্তির প্রাক বিবাহ চরিত্র চমৎকার ফুঠেছে। বিবাহ পরবর্তী দুঃখভোগের ছবি বুঝে নিতে পারা যায়, মৃত্যু একেবারে রহস্যাবৃত। ফলে ‘পুঁইমাচা’ তার স্বভাবের প্রতিই ইঙ্গিত করল, পরিণতিকে দ্যোতিত করলো না। কাজেই গল্পের পরিণতি যথার্থ ‘tragic’ হতে পারল না, শুধু স্বভাবদোষের Symbolic • হয়ে রইল। সহজ সরল জীবন বর্ণনায় এই “Entreme reatity”-কে না আনার প্রবণতা- ‘পুঁইমাচা’কে লোভী দেহকে সুস্পষ্ট করলেও, তার শিকড়ের রসে অশ্রুসিক্ত করতে পারেনি।

‘পুঁইমাচা’ তবু দ্বিতীয়রহিত সার্থক ছোটগল্প। সহানুভূতি এবং মমত্বের ফল্গুধারায়, ‘না বলা বাণীতে। বিভূতিভূষণ যে নির্মমতা হীন সমাজের লোক ও লেখক ছিলেন, প্রকৃতি প্রেমিক ছিলেন-তাঁর সেই সহজ সরল জীবনের Idea-র EIDerado (কল্পনার স্বর্গরাজ্য) পুঁইমাচা গল্পটি।